সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১০ পূর্বাহ্ন
ভয়েস নিউজ ডেস্ক:
প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ছুটে যান হাজারো নারী। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত, সেন্টমার্টিন, সাজেক, কুয়াকাটা কিংবা সিলেটের পাহাড়-ঝরনা সবখানেই বাড়ছে নারী পর্যটকের উপস্থিতি। তবে ভ্রমণের আনন্দের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নও রয়ে গেছে। বিশেষ করে হয়রানি, নির্জন এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা, রাতের চলাচল এবং জরুরি সহায়তা পাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বাংলাদেশে নারী ও মেয়েদের জন্য জনপরিসরে হয়রানি একটি বিস্তৃত সমস্যা। জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের বাংলাদেশবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের একটি বিশ্লেষণে ৮৪ শতাংশ নারী কর্মক্ষেত্র ও জনপরিসরে যৌন হয়রানির মুখোমুখি হওয়ার কথা উঠে আসে। তবে এই পরিসংখ্যান সরাসরি পর্যটনকেন্দ্রের নারী পর্যটকদের ওপর করা জরিপ নয়।
পর্যটনকেন্দ্রে নারীদের নিরাপত্তার বাস্তব চিত্রের একটি উদাহরণ পাওয়া যায় কক্সবাজারে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সমুদ্রসৈকত ও লালদীঘি এলাকায় কয়েকজন নারীকে হয়রানি ও মারধরের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে অন্তত সাতটি ভিডিওর কথা উঠে আসে। এ ঘটনায় একজন নারীকে রাতে সৈকত থেকে চলে যেতে বাধ্য করা এবং অন্য নারীদের মারধরের অভিযোগও ছিল। পরে পুলিশ অভিযুক্ত একজনকে গ্রেফতার করে এবং মামলা হয়।
ঘটনাটি নতুন করে প্রশ্ন তোলে- জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা থাকলেও নারী পর্যটকদের জন্য তা কতটা কার্যকর?
নিরাপত্তাব্যবস্থা আছে, তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে
পর্যটকদের নিরাপত্তায় দেশে ট্যুরিস্ট পুলিশের আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ প্রতিরোধ, মাদকবিরোধী অভিযান, নিখোঁজ পর্যটক উদ্ধারে সহায়তা এবং স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় তাদের দায়িত্বের অংশ।
কক্সবাজারেও রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যালয়। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অফিস লাবণী পয়েন্টে এবং সেখানে যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বরও দেওয়া হয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইটে জরুরি সহায়তার জন্য জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং সরকারি তথ্যসেবা ৩৩৩-এর তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু পুলিশি উপস্থিতি থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। পর্যটনকেন্দ্রের আলোকসজ্জা, সিসিটিভি, নারী পুলিশ বা প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মীর উপস্থিতি, জরুরি অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা এবং নির্জন এলাকায় দ্রুত সহায়তা পৌঁছানোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
কক্সবাজারে রাতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
নারী পর্যটকদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রাতের সময়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যের বর্তমান বাংলাদেশ ভ্রমণ-নির্দেশনায় নারী ভ্রমণকারীদের মৌখিক ও শারীরিক হয়রানির ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে নির্জন এলাকা এড়িয়ে চলা এবং রাতে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা শুধু হয়রানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সমুদ্রের ঝুঁকিও রয়েছে। ২০২৪ সালের সাংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় বছরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পানিতে ডুবে ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং প্রায় ৭০০ পর্যটককে ঝুঁকিপূর্ণ পানি থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। তখন ২৭ জন লাইফগার্ড ও স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছিলেন, যদিও সংশ্লিষ্টরা পর্যটকের তুলনায় জনবলকে অপর্যাপ্ত বলেছিলেন।
অর্থাৎ নারী পর্যটকের নিরাপত্তা বলতে শুধু অপরাধ থেকে সুরক্ষা নয়- সমুদ্র, পাহাড়, যানবাহন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হয়।
একা ভ্রমণে বাড়তি সতর্কতা
নারীদের একা ভ্রমণের প্রবণতা বাড়লেও পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সব জায়গায় একা নারী পর্যটকের জন্য সমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত জাতীয় পর্যায়ের গবেষণা নেই।
তবে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ-নির্দেশনায় বাংলাদেশে একা নারীদের রাতে গণপরিবহন ব্যবহারে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ভ্রমণ পরামর্শে বাস, রিকশা, ট্যাক্সি ও ট্রেনে বিশেষ করে রাতে একা চলাচলের ক্ষেত্রে অপরাধের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে নারী পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি যাতায়াত ব্যবস্থাকেও নিরাপত্তার আওতায় আনা প্রয়োজন।
কী চান নারী পর্যটকরা?
নারী পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। যেমন- প্রকাশ্য স্থানে পর্যাপ্ত আলো, কার্যকর সিসিটিভি, দৃশ্যমান টহল, নারী পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, নিরাপদ পরিবহন এবং হোটেল-রেস্তোরাঁয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রে কোনও নারী হয়রানির শিকার হলে তাকে দোষারোপ না করে দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়াও জরুরি।
নিরাপদ পর্যটনই টেকসই পর্যটনের শর্ত
বাংলাদেশে পর্যটনের সম্ভাবনা বাড়লেও নিরাপত্তার প্রশ্নটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ এবং পর্যটন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। গবেষণাটি পর্যটন পুলিশের নিরাপত্তা উদ্যোগ ও জনসাধারণের নিরাপত্তা-ধারণার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই প্রশ্নটি শুধু কত মানুষ পর্যটনকেন্দ্রে যাচ্ছে, তা নয়। প্রশ্ন হওয়া দরকার নারী, শিশু, একা ভ্রমণকারী এবং সব ধরনের পর্যটকের জন্য সেই স্থান কতটা নিরাপদ?
নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে পর্যটন শুধু বিনোদনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের অর্থনীতি, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং নারীদের স্বাধীনভাবে ভ্রমণের সুযোগও আরও বিস্তৃত হবে।
জরুরি প্রয়োজনে: পর্যটনকেন্দ্রে বিপদে পড়লে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং সরকারি তথ্য ও সেবা ৩৩৩-এ যোগাযোগ করা যায়। ট্যুরিস্ট পুলিশের স্থানীয় যোগাযোগ নম্বরও সংশ্লিষ্ট সরকারি ওয়েবসাইটে দেওয়া রয়েছে।
ভয়েস/আআ